মুফতি তারিক মাসউদের বক্তব্যে

পাকিস্তানে কাবার দিকে পা রাখা বা কুরআনের দিকে পিঠ ফেরানোকে হারাম মনে করা হয়। এটা একটা ইলমি মাসআলা যে, কাবার দিকে পা রাখা জায়েজ কি না। আরব উলামারা বলেন, এটা জায়েজ, কারণ এটাকে নাজায়েজ বলার কোনো দলিল নেই। আমাদের উপমহাদেশের উলামারা বলেন, এটা নাজায়েজ, কারণ এটাকে জায়েজ বলারও কোনো দলিল নেই। বুঝতে পারছেন কথাটা? এটা চিন্তার পার্থক্য। আরব উলামারা বলেন, জায়েজ, কারণ নাজায়েজ বলার দলিল নেই। আমরা বলি, কুরআনে আল্লাহ তাআলা শা’আইরুল্লাহর (আল্লাহর নিদর্শনের) সম্মান ও সম্মান প্রদর্শনের নির্দেশ দিয়েছেন। বুঝতে পারছেন? আল্লাহ কী নির্দেশ দিয়েছেন? যে ব্যক্তি আল্লাহর নিদর্শনের সম্মান করে, সেটা তার অন্তরের তাকওয়ার লক্ষণ। যখন আল্লাহ বলেছেন, শা’আইরুল্লাহর সম্মান করতে হবে, আর সবচেয়ে বড় শা’আইর হলো বাইতুল্লাহ। তাহলে বাইতুল্লাহর সম্মান করা তো ফরজ। আমরা বলি, যখন কুরআন বলেছে বাইতুল্লাহর সম্মান করা ফরজ, তখন প্রতিটি বিষয়ে কুরআন এটা করো, ওটা করো না—এমন বলবে না। সমাজে যেটা অসম্মান বলে গণ্য হয়, সেটা বাইতুল্লাহর ক্ষেত্রেও করা জায়েজ হবে না। যেমন, আপনি আপনার বাবার সামনে পা ছড়িয়ে বা তার দিকে পা করে বসতে পারবেন না। ধরুন, আপনি বাবার দিকে পা করে বসে আছেন। বাবা রেগে গেলেন, বললেন, “এটা কী করছ?” আপনি বললেন, “বাবা, এটা নাজায়েজ বলে কোনো সহীহ হাদিস নেই।” বাবা কি এই দলিল মেনে নেবেন? বাবা বলবেন, “আল্লাহ তো বলেছেন, মা-বাবার সম্মান করতে।” আপনি বললেন, “হ্যাঁ।” তিনি বলবেন, “বেটা, এটা সম্মানের বিরুদ্ধে।” সমাজে যা সম্মানের বিরুদ্ধে বলে গণ্য, তা শরিয়তে নাজায়েজ।
তাই বাইতুল্লাহর দিকে পা করা ১০০% সম্মানের বিরুদ্ধে। এতে দুই মত নেই। বাইতুল্লাহর দিকে থুথু ফেলতে নবী (সা.) নিষেধ করেছেন। তাহলে পা করাও নিশ্চয়ই অসম্মান। এটাকে নাজায়েজ বলার দলিল জিজ্ঞাসা করা হবে না, বরং যে বলে এটা জায়েজ, তাকে দলিল জিজ্ঞাসা করা হবে। দলিল তো দাবিদারের ওপর বর্তায়। তবে নবী (সা.) বাইতুল্লাহর দিকে পিঠ ফিরিয়েছিলেন, সেটা জায়েজ ছিল। কারণ, এমন সম্মান যাতে মানুষ কষ্টে পড়ে, তা শরিয়তে পছন্দনীয় নয়। সম্মানেরও একটা সীমা আছে। যদি বাইতুল্লাহর দিকে পিঠ ফেরানোও নাজায়েজ হয়, তাহলে হজের সময় লাখো মানুষের মধ্যে কে পিঠ ফেরাবে না? এটা তো বড় সমস্যা হয়ে যাবে। তাই নবী (সা.) পিঠ ফিরিয়েছেন, যাতে মানুষ জানে এটা জায়েজ। পিঠ ফেরানো জায়েজ, কিন্তু পা করা জায়েজ নয়। তবে যেখানে প্রয়োজন, সেখানে পা করাও জায়েজ। যেমন, অক্ষম ব্যক্তিদের জন্য পা ভাঁজ করে নামাজ পড়া কষ্টকর। তারা বাইতুল্লাহর দিকে পা ছড়িয়ে নামাজ পড়তে পারেন। হাসপাতালে রোগীর বিছানা কিবলার দিকে থাকলে, তার জন্য এটা বাধ্যতামূলক। তখন এটা জায়েজ। একইভাবে, কুরআনের দিকে বিনা কারণে পিঠ ফেরানো ঠিক নয়। কিন্তু যেখানে পিঠ ফেরানো ছাড়া উপায় নেই, সেখানে কোনো সমস্যা নেই। আরব দেশে দেখা যায়, মসজিদের পেছনের সারিতে লোকজন কুরআন পড়ছেন। এটা জায়েজ, কারণ এটা প্রয়োজনের মধ্যে পড়ে। যদি এটাকে জায়েজ না বলা হয়, তাহলে শুধু সামনের সারির লোকই কুরআন পড়তে পারবে। পেছনের সারির লোক পড়তে পারবে না। এটা তো অনেক মানুষকে কুরআন তিলাওয়াত থেকে বঞ্চিত করা হবে।
আমাদের এখানে অনেকে এত টেনশন দিয়ে রাখে—পিঠ হচ্ছে, পিঠ হচ্ছে! তখন বেচারা কোণ ঘুরিয়ে বসে থাকে, তার শরীরের অ্যালাইনমেন্ট নষ্ট হয়ে যায়। আদব-তামিজ মানা উচিত, কিন্তু তা নিয়ে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করা উচিত নয়। আমাদের মসজিদে অনেকে পেছনে কুরআন পড়তে দেয় না, বলে পিঠ হচ্ছে। এটা ভুল রেওয়াজ। পেছনেও কুরআন পড়া উচিত। যদি কারো পিঠ হয়, তাতে তৌহিনের নিয়ত না থাকলে এবং প্রয়োজন থাকলে, এটা শরিয়তে জায়েজ। এটা এমন যে, একজন কারি সাহেব তার ছাত্রকে তাজবিদ শেখাচ্ছিলেন। বললেন, তাজবিদ ছাড়া কিছু করা যাবে না। এমনকি ছুটি চাইতেও তাজবিদের সঙ্গে চাইতে হবে। একদিন কারি সাহেবের কাপড়ে আগুন লাগল। ছাত্র বলল, “কারি সাহেব, আপনার কাপড়ে চিঙ্গারি!” তারপর তাজবিদের কথা মনে পড়ল, নুনের গুন্না ভুলে গেল। ততক্ষণে কারি সাহেবের কাপড় পুড়ে গেছে। প্রয়োজনের সময় আদব-তামিজ দেখা যায় না, আগুন নিভিয়ে ফেলতে হয়। একইভাবে, ধরুন, কারো চায়ে মাছি পড়েছে। তিনি আপনার বড় বা উস্তাদ। তিনি কথা বলতে বলতে চা খাচ্ছেন। মাছি পেটে চলে যাওয়ার আশঙ্কা। তখন কি আদব করে বলবেন, “হুজুর, মাছি আছে”? না, আপনি তার হাত সরিয়ে বলবেন, “মাছি মুখে যাচ্ছে!” তখন এই বেয়াদবিতে সওয়াব হবে। একইভাবে, বাবা-মা বুড়ো হয়ে গেলে মাঝে মাঝে তাদের ওষুধ খাওয়াতে বেয়াদবি করতে হয়। দেখতে বেয়াদবি মনে হলেও, এটা তাদের ভালোর জন্য। তাই কুরআনের ব্যাপারেও আদব করা ফরজ, কিন্তু এমনভাবে নয় যে তিলাওয়াত থেকে বঞ্চিত হয়ে যাই। নবী (সা.) বাইতুল্লাহর দিকে পিঠ করে কথা বলতেন। তিনি চাইলে মুখ ফিরিয়ে কথা বলতে পারতেন। কিন্তু তা করলে উম্মত কষ্টে পড়ত। তাই এখানে অনেকে কুরআন পড়ে না, বলে পিঠ হয়ে যাবে। এটা ঠিক না। কুরআন পড়তে দিন।
Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url